অবশেষে ছক্কার ঝড়! নতুন রূপে বাংলাদেশ ক্রিকেট!

 

অবশেষে কি তবে ছক্কা হাঁকানোটা শিখতে পেরেছে বাংলাদেশ? টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট রানের খেলা। রান করতে হলে বেশি বেশি ছক্কা হাঁকানো বেশ জরুরি। তবে এই ছক্কা হাঁকানোর প্রতিযোগিতাতে এতদিন বেশ পিছিয়ে ছিল বাংলাদেশ দল।



সর্বশেষ দুই বছরে ছক্কা হাঁকানোতে বেশ উন্নতি হয়েছে বাংলাদেশ দলের। ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে ম্যাচপ্রতি গড়ে ৫টির বেশি করে ছক্কা হাঁকিয়েছে বাংলাদেশ। যেখানে ২০০৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের ম্যাচপ্রতি গড়ে ছক্কাসংখ্যা ছিল ৪ এর চেয়েও কম।  




২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে ১০০টি ছক্কা হাঁকিয়েছে বাংলাদেশ, (নেদারল্যান্ডস সিরিজের আগ পর্যন্ত) যা দলগত হিসাবে সর্বোচ্চ। ৮৪ ছক্কা নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে পাকিস্তান। ৭৮ ছক্কা হাঁকানো নিউজিল্যান্ড আছে ৩ নম্বরে। কয়েক বছর আগেও এমন পরিসংখ্যান বাংলাদেশের পাঁড় ভক্তও বিশ্বাস করতে চাইতেন কিনা সন্দেহ আছে।    



২০০৬ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে ম্যাচপ্রতি গড়ে ৩.৮১টি করে ছক্কা হাঁকিয়েছে বাংলাদেশ, যা টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০২৪ সালে ম্যাচপ্রতি গড়ে ৫.০৮টি ছক্কা হাঁকিয়েছে বাংলাদেশ। ২০২৫ সালে যা আরও বেড়েছে, হয়েছে ৭.৭৩টি।    




চলতি বছরে একের পর এক ছক্কা হাঁকানো বাংলাদেশ দল নিশ্চিতভাবেই চাইবে এশিয়া কাপেও এমন আগ্রাসী ব্যাটিংয়ে ছক্কা হাঁকিয়ে প্রতিপক্ষকে নাস্তনাবুদ করে দিতে। দলে একগাদা তরুণ ক্রিকেটার। যারা ছক্কা হাঁকাতেও বেশ পটু। বহুদিন পর টাইগারদের ওপেনিং জুটিতে যেন প্রাণ ফিরেছে। তানজিদ হাসান তামিম এবং পারভেজ হোসেন ইমনের জুটিটা জমছে বেশ। বাংলাদেশের এই ছক্কাবিপ্লবের যুগে সামনের কাতারে আছেন তানজিদ এবং ইমন। তানজিদের ছক্কা ২৪টি, ইমনের ছক্কা ২৩টি।    




লোয়ার মিডল অর্ডারের দুই নির্ভরযোগ্য ব্যাটার জাকের আলী অনিক এবং শামীম হোসেন পাটোয়ারীও ছক্কা হাঁকানোতে পিছিয়ে নেই। জাকেরের ছক্কা ২৭টি, শামীমের ছক্কা ২৪টি। নতুন যুগে এই তরুণদের ভর করেই ছক্কাবিপ্লবের যুগে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ দল।    



২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে ছক্কা হাঁকানোর জন্য গড়ে ৯.৫টি করে বল লেগেছে বাংলাদেশ দলের। ২০২৪-২৫ সালে যা নেমে এসেছে গড়ে ৫.৫৮টি বলে। অর্থাৎ এখন আগের চেয়ে অনেক কম বল খেলেই ছক্কা হাঁকাতে পারছেন টাইগাররা।  




২০০৫ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে একটি ছক্কা হাঁকাতে গড়ে ২৯.৫৮টি বল লেগেছিল বাংলাদেশের, যা টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ৭.২০ রান রেটে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে রান তুলেছিল বাংলাদেশ, যা আইসিসির পূর্ণ সদস্য দেশের মধ্যে সর্বনিম্ন। রান রেট এখন বেড়ে ৭.৮১, যা এখনও অত বেশি না হলেও কিছুটা উন্নতি অবশ্যই হয়েছে।    




দলের এমন ছক্কা হাঁকানোর উন্নতির পেছনে বেশ কিছু ব্যাপার আছে। সর্বশেষ ২ বছরে মিরপুরের বাইরে অনেক টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ দল। মিরপুরে যেখানে ১২০-১৩০-১৪০ রানই জেতার মত রান, চট্টগ্রাম বা সিলেটে সেখানে হাইস্কোরিং গ্রাউন্ড। ১৮০-২০০ রানের কাছাকাছি উইকেটও দেখা যায় সিলেট বা চট্টগ্রামে। গত কয়েক বছরে মিরপুর থেকে টি-টোয়েন্টি ম্যাচকে বের করে সিলেট বা চট্টগ্রামে নিয়মিত খেলাটাও ক্রিকেটারদের ছক্কা হাঁকানোর সামর্থ্য বাড়ানোতে ভূমিকা রেখেছে। মিরপুরে ম্যাচ খেলে অভ্যস্ত টাইগারদের স্বাধীনতা এবং ছক্কা হাঁকানোর সামর্থ্য বাড়াতে সিলেট বা চট্টগ্রামের হাইস্কোরিং উইকেট বেশ জরুরি।    




এর বাইরে দলে নতুন মুখদের ছড়াছড়িও ছক্কাবিপ্লব শুরুর একটি বড় কারণ। সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ – এই চার সিনিয়রের কেউ এখন আর জাতীয় দলে নেই। তাদের জায়গায় এসেছেন একগাদা নতুন মুখ। তানজিদ হাসান তামিম, পারভেজ হোসেন ইমন, তাওহিদ হৃদয়, জাকের আলী অনিক, শামীম হোসেন পাটোয়ারীরা এখন টি-টোয়েন্টি দলের নিয়মিত সদস্য। জাতীয় দলের ছক্কাবিপ্লবের সামনের সারির নেতা ইমন-জাকের-শামীমরা। দলের নতুন মুখরাই নতুন দিনের সূচনা এনে দিচ্ছেন, অন্তত টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে।    




বাংলাদেশ জাতীয় দলের সিনিয়র সহকারী কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বেশ কাছ থেকে কাজ করছেন ক্রিকেটারদের সাথে। ক্রিকেটারদের ছক্কা হাঁকানো নিয়ে সালাউদ্দিন ইএসপিএন ক্রিকইনফোকে জানিয়েছেন, ‘দলে প্লেয়ারদের খেলার ব্যাপারে অনেক স্বাধীনতা আছে। আমরা জানি, তামিম, ইমন, হৃদয়, জাকেররা কীভাবে ব্যাট করতে চায়। তারা আগ্রাসীভাবে ব্যাট চালাতে পছন্দ করে। এর প্রভাবটা দলে পড়ছে। এর পাশাপাশি তারা টেকনিক্যালিও অনেক উন্নতি করছে যার ফলে ক্রিজে তারা অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যাট করছে।’    




সালাউদ্দিন আরও বলেছেন, ‘যাদের ছক্কা হাঁকানোর সামর্থ্য আছে তাদের জন্য ছক্কা হাঁকানোটা একটা ন্যাচারাল প্রসেস। বেশিরভাগ ছেলেরা একই পজিশনে লম্বা সময় ধরে খেলছে। তারা তাদের রোল সম্পর্কে জানে। তারা ট্রেনিংয়েও নিজেদের উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করে, উন্নতির পেছনে যা একটি কারণ। ঘরোয়া ওয়ানডে ক্রিকেটে তারা আরও অনেক ভালো পিচে খেলে থাকে।’  




জাকের আলী অনিককে নিয়ে বেশ উচ্ছ্বসিত সালাউদ্দিন। আগে থেকেই জাকেরের খেলার বড় সমর্থক ছিলেন কোচ। তার মতে, ‘জাকের জানে তাকে ২০ বলের মত মোকাবেলা করতে হবে। তাকে এই অল্প সময়ের মধ্যেই কিছু ছক্কা হাঁকাতে হবে। আপনি দেখবেন সে শুরু করছে একভাবে এবং শেষ করছে অন্যভাবে। সে এই কাজে অভ্যস্ত হয়ে গেছে।’    




এছাড়া ফিনিশিংয়ে মোটামুটি দায়িত্ব নিতে শিখে গেছেন শামীম পাটোয়ারীও। শামীমকে নিয়ে সালাউদ্দিন জানান, ‘আমার মনে হয় সে তার মাইন্ডসেট চেঞ্জ করেছে। উইকেটের পেছনে খেলায় সে অভ্যস্ত ছিল। কোচিং স্টাফের দায়িত্ব ছিল তাকে উইকেটের সামনেও খেলার আত্মবিশ্বাস দেওয়া। আমার মনে হয় এখন সে বুঝতে পেরেছে সে সব দিকেই খেলতে পারে। এটা দলের জন্য বড় সুবিধা যে আমাদের এখন ভালো দুইজন ফিনিশার আছে।’  




নতুন যুগের নতুন অ্যাপ্রোচের টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের কথা আগেও বহুবার বলেছেন বাংলাদেশের ক্রিকেট সংশ্লিষ্টরা। যদিও সেসবের প্রতিফলন মাঠে দেখা গেছে কমই। এবারের নতুন ধাঁচের শুরু, আবহ আগের চেয়ে অনেকটাই ভিন্ন। মাঠের ক্রিকেটে, পরিসংখ্যানে, ম্যাচের ফলে নতুন বাংলাদেশের কিছুটা ছাপ পড়ছেও। টি-টোয়েন্টিতে বরাবরই দুর্বল দল বাংলাদেশ এখনই শক্তিধর দল হয়ে যাচ্ছে না যদিও। তবে উন্নতির রেখাটা অন্তত দেখা যাচ্ছে দেশের ক্রিকেটের বড় আকাশে।    




সর্বশেষ ৩টি টি-টোয়েন্টি সিরিজ জিতে এশিয়া কাপ খেলতে গেছে বাংলাদেশ দল। ঘরের মাঠে পাকিস্তান এবং নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে সিরিজ জেতার আগে শ্রীলঙ্কার মাটিতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষেও জয় আছে বাঙ্গালদেশের। ওপেনিং জুটিটাও অনেক দিন পর যুতসই মনে হচ্ছে। একদিন তানজিদ রান করলে আরেক দিন রান করে দিচ্ছেন ইমন। ফিনিশিংয়ে শামীম-জাকের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চালাচ্ছেন টর্নেডো ব্যাটিং। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে বাংলাদেশের এমন পারফরম্যান্স দেখার অপেক্ষাটা তো বহু দিনের।     বোলিং বেশ আগে থেকেই বাংলাদেশের শক্তির জায়গা ছিল। বর্তমান পেস ইউনিট নিশ্চিতভাবেই দেশের ইতিহাসের অন্যতম সেরা। স্পিন ইউনিটেও আছে বৈচিত্র্য। অফ, লেগ স্পিনারের সাথে রয়েছে বাঁহাতি স্পিনের ভেলকিও। দল হিসেবে জ্বলে উঠতে পারলে এশিয়া কাপে দারুণ কিছুর প্রত্যাশা বাংলাদেশ করতেই পারে।    




এশিয়া কাপের ‘বি’ গ্রুপে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ হংকং, আফগানিস্তান এবং শ্রীলঙ্কা। আফগান এবং লঙ্কানরা নিশ্চিতভাবেই টাইগারদের ছেড়ে কথা বলবে না। তবে উন্নতির গ্রাফটা চলমান রাখতে তাদের গুঁড়িয়েই সামনে এগোতে হবে বাংলাদেশকে।


Post a Comment

Previous Post Next Post